রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমছে না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের লোকসান কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। লোকসান বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকির চাপও বেড়ে গেছে। একইভাবে সরকারি বহু প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের দায়দেনা যেমন রয়েছে, তেমনি পরিষেবা বিল বাবদও বড় অঙ্কের টাকা বকেয়া থাকছে প্রতি বছরই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, লোকসান করলেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়ন করা হয় এবং বছরের পর বছর লোকসানি সংস্হাগুলোকে ভর্তুকি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়। পুরোপুরি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা না করা, ব্যবস্হাপনায় অযোগ্যদের স্হান পাওয়াসহ নানা কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত লোকসান দিয়েই আসছে। হাল আমলে এসব লোকসানের পূর্ণাঙ্গ তথ্যও প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরে সরকারি ১২টি প্রতিষ্ঠানের নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা।

অর্থ বিভাগ সূত্র মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লোকসানে ছিল আটটি প্রতিষ্ঠান। এই তালিকা পরের বছরগুলোতে দীর্ঘায়িত হয়েছে। গত অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি এই ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান দিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি।

গত ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের হিসাবে টিসিবি সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংস্হাটির লোকসানের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৮৬ কোটি টাকা। তবে তার আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংস্হাটি ৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা লাভ করেছিল। করোনা পরিস্হিতিতে সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে কিনে তা টিসিবির মাধ্যমে কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এবছরও এই কার্যক্রম আরো বাড়ানো হয়েছে। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানটির লোকসান বাড়ছে।

গত অর্থবছরে শীর্ষ লোকসানি সংস্হার দ্বিতীয় স্হানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)। গত অর্থবছর এ সংস্হাটি লোকসান গুনেছে ৯৭১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছর সংস্হার লোকসান ছিল ৯২৯ কোটি ৯ লাখ টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লোকসান দিয়েছিল ৭০২ কোটি ১৮ লাখ টাকা। লোকসানে থাকা তৃতীয় স্হানে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। গত অর্থবছরে সংস্হাটি ৬৭৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা নিট লোকসান করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে কমেছে। ঐ অর্থবছরে বিসিআইসি লোকসান করেছিল ৭০২ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে লোকসান করেছিল ৫৭৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

সরকারি সব কটি পাটকল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) গত অর্থবছরের তুলনায় নিট লোকসানের পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে বিজেএমসির নিট লোকসান হয়েছে ৩৮০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছরে সংস্হাটি লোকসান দিয়েছিল ৭৭৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংস্হাটির লোকসানের পরিমাণ ছিল ৬০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। বিটিএমসির ২৫টি পাটকলের মধ্যে ২৪টি বন্ধ রয়েছে এবং একটি ভাড়ায় চলছে। বন্ধ ২৪টির মধ্যে দুটিতে টেক্সটাইল পল্লী স্হাপন এবং দুটি পিপিপিতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা যায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) গত অর্থবছরে ১২৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে।

তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি তিন কোটি ৯৩ লাখ টাকা লাভ করেছিল। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্হা (বিআরটিসি) গত অর্থবছরে লোকসান দিয়েছে ৯২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। তার আগের অর্থবছরে সংস্হাটি ১২৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা লোকসান গুনেছিল। সে হিসাবে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান কিছুটা কমেছে। তবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ছিল ১০৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) ৮১ কোটি ৬ লাখ টাকা, বাংলাদেশ মত্স্য উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি) ২০ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ বস্ত্র শিল্প করপোরেশন (বিটিএমসি) ১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিএসসিআইসি) ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.