পল্লবী থানায় আরেকটি মামলা: আলোচনায় থাকতেই বিতর্কে জড়ান হেলেনা

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলতেন

আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী হেলেনা জাহাঙ্গীর বেশকিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ব্যবসায়ীদের কয়েকটি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও তিনি অধিষ্ঠিত হন। সচ্ছল পরিবারে জন্ম নেওয়া হেলেনার দাম্পত্য জীবনও ছিল অর্থবিত্তে পরিপূর্ণ। বিপদে সাধারণ মানুষের পাশেও তিনি ছিলেন বিভিন্ন সময়ে। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। কিন্তু যশ-খ্যাতির পেছনে তিনি ছুটতে শুরু করেন। রাজনীতিতে জড়িত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনেও তিনি সম্পৃক্ত হন। ঢাকার নামিদামি প্রায় ১২টি ক্লাবের সদস্যপদ নেন তিনি।

নিজের প্রচার-প্রচারণার জন্য গড়ে তোলেন আইপি টিভি চ্যানেল। সেখানে কখনো আলোচক, কখনো উপস্থাপক হিসাবে তিনি অংশ নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক বিতর্কিত পোস্ট ও লাইভ করেন তিনি, যা দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।

নানা অভিযোগে আলোচিত হেলেনা জাহাঙ্গীরকে র‌্যাব গ্রেফতার করে। বৃহস্পতিবার রাতে তার বিরুদ্ধে গুলশান ও পল্লবী থানায় তিনটি মামলা করা হয়। এর মধ্যে গুলশান থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে গুলশান থানায় একটি এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনে পল্লবী থানায় একটি মামলা হয়েছে। এর আগে র‌্যাবের অভিযানে গুলশান-২-এর ৩৬ নম্বর সড়কের হেলেনা জাহাঙ্গীরের পাঁচ নম্বর বাসা থেকে বিদেশি মদ, ওয়াকিটকি সেট, ফরেন কারেন্সি (বৈদেশিক মুদ্রা), ক্যাসিনো সরঞ্জাম এবং হরিণ ও ক্যাঙ্গারুর চামড়া উদ্ধার করা হয়।

রিমান্ডে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। জানতে চাইলে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলো সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে তিনি কিছু তথ্যও দিয়েছেন। আমরা সব বিবেচনায় নিয়ে মামলার তদন্ত অব্যাহত রাখব।

সূত্র জানায়, রিমান্ডে হেলেনা জাহাঙ্গীরের আগের সেই মনোবল আর নেই। গ্রেফতারসহ ঘটনাপরম্পরায় তিনি অনেকটা হতবাক হয়েছেন। সম্প্রতি ফেসবুকে ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি সংগঠনের নেতা বানানোর ঘোষণা দিয়ে ছবি পোস্ট করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন হেলেনা। এরপর তাকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটি থেকে বহিষ্কার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, হেলেনা জাহাঙ্গীরের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির তেমন কোনো বড় ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপরও তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অযাচিত বেফাঁস মন্তব্য। যেখানে তিনি সরকার ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ব্যক্তিকে জড়িয়ে বা তুচ্ছজ্ঞান করে নানা ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। ফেসবুকে অসংখ্য অনুসারী থাকায় মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ত, যা অনেকের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। বিব্রত অনেকে এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও একাধিক অভিযোগ করেন। তবে তিনি কোনোভাবেই থামছিলেন না। বরং একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

সূত্রগুলো বলছে, হেলেনা জাহাঙ্গীরের অর্থবিত্তের কোনো কিছুরই ঘাটতি ছিল না। ব্যবসার বাইরে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জনের জন্যও সেভাবে মরিয়া ছিলেন না তিনি। তবে খ্যাতিলাভের জন্য তিনি উদ্গ্রীব ছিলেন। সব সমস্যার শুরু মূলত এখানেই। ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি। পোস্টারে ছেয়ে ফেলেছিলেন নগরীর বিভিন্ন এলাকা। সম্প্রতি কুমিল্লা-৫ আসনের উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান তিনি। রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সুযোগ পেলে ছবি তুলতেন তিনি। এর বাইরে তথাকথিত কয়েকটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনেও যোগ দেন তিনি। যেখানে তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদ। এসব সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা যেত তাকে। সেগুলো গুরুত্বসহকারে আইপি টিভি ‘জয়যাত্রা টেলিভিশনে’ প্রচার হতো।

র‌্যাব জানায়, অনৈতিক পন্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে খ্যাতনামা হিসাবে উপস্থাপন করতে হেলেনা জাহাঙ্গীর চতুরতার আশ্রয় নেন। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তিনি একটি সংঘবদ্ধ চক্র তৈরি করেন। একটি উচ্চাভিলাষী উদ্দেশ্যে তিনি এ ধরনের কর্মে লিপ্ত ছিলেন। মাদার তেরেসা, পল্লিমাতা, প্রবাসীমাতা হিসাবে পরিচিতি পেতে তিনি জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছেন। তার প্রচেষ্টায় সংঘবদ্ধ চক্রটি ভুয়া খেতাবের জন্য প্রচার চালাত।

জানা যায়, হেলেনা জাহাঙ্গীরের খ্যাতিলাভের এ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তার আশপাশে গড়ে ওঠে বিশাল এক সিন্ডিকেট। আইপি টিভি ‘জয়যাত্রা টেলিভিশন’-এর নাম ভাঙিয়ে তারা সারা দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন। বিভিন্নজনকে সাংবাদিক ‘বানিয়ে’ বেতন দেওয়ার পরিবর্তে তাদের থেকে তারা নিয়মিত টাকা নিতেন। ‘জয়যাত্রা টেলিভিশনে’ নিয়োগ দেওয়া এমন এক জেলা প্রতিনিধি চাঁদাবাজির মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকও হয়েছেন। এছাড়া তোষামোদি করতে গিয়ে টেলিভিশনে ‘হাস্যরসাত্মক’ বিভিন্ন ভূমিকায় হেলেনা জাহাঙ্গীরকে সামনে আনে চক্রটি। এর বাইরে অনেক ভুঁইফোড় সংগঠন, নামসর্বস্ব পত্রিকা ও অনলাইন নিউজের আইডি কার্ডও ছিল হেলেনা জাহাঙ্গীরের। এছাড়া তিনি নিজেকে ‘আইপি টিভি ওনারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠনের সভাপতি বলেও পরিচয় দিতেন।

Leave a Comment